কর্মক্ষেত্রে আর পরিবারে!
ইসলামের বিষয় গুলো নিয়ে অমুসলিমদের যেসব প্রশ্ন সেগুলোর ব্যপারে অনেকেই এখন গবেষণা করছে। কিন্তু মুসলিমদের আচার ব্যবহারের ত্রুটি গুলো নিয়ে যে প্রশ্নটা কেবল সময়ের ব্যবধানে একে একে জমা হচ্ছে। ধর্ষণ, দুর্নীতি, অন্যের সম্পদ দখল, অন্যের স্ত্রীকে উত্যেক্ত করা। এগুলো থেকে বেরুতে না পারলে আপনি আল্লাহের কৃপা কিভাবে আশা করেন?
ধরেন, আল্লাহের জন্যে আপনার মনে অল্প একটু ভালবাসা আছে। সেই ভালবাসা যদি হয় ভেজাল তাহলে কি সেটাকে ভালবাসা বলা যাবে? সেই ভালবাসা যদি আপনাকে আল্লাহের নির্দেশের দিকে না নেয় তাহলে আল্লাহের কি এমন বাঁধায় ধরা যে আপনাকে জান্নাতে নিতে হবে?
আপনি যদি বলেন, নাহ অনেক হয়েছে আজকে থেকে আমি ভালো হয়ে যাবো। তাহলে আপনার জন্যেই জান্নাতের সুখবর। আপনি আল্লাহের দিকে ফিরে আসুন। আপনাকে আল্লাহ্ নিজেই জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে!
সিদ্ধান্ত আপনার, বিচার আল্লাহের।
বড়বোন সানজিদার মাঝে হঠাৎ কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা দেখতে পাচ্ছিলাম, সে একনিষ্ঠ ভাবে নিবিষ্ট মনে কয়েকদিন যাবত সময় নিয়ে একটা ভিডিও এডিটি করে যাচ্ছে। জানি না কিসের ভিডিও, কিন্তু কানে হেডফোন লাগিয়ে বেশ গুরুত্বসহকারে এডিট করে যাচ্ছে।
এর কিছুদিন পর এডিটিং শেষ হলে, সে নিজেই আমাকে তার এডিট করা ভিডিওটা দেখতে দেয়। শিরোনাম “ ‘সাদিয়া’স’ সরিস কাউন্ট।”
ভিডিওতে একটা মেয়ে কানে হ্যেডফোন লাগিয়ে সম্ভবত ডাবিঙে কণ্ঠ দিচ্ছে, এবং অনেক সময় লিপিঙ্গের সাথে এডজাস্ট করতে না পেরে নিজের এরোর গুলোকে আডমিট করে, প্রতিবার বিনয়ী হয়ে সরি বলছে।এটা সবার বেলায়ই হয়, সে সব সরিকে একসাথে করে এই ভিডিওতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে মোট ৫০+ বার সরি বলেছে মেয়েটা।
সানজিদা আপা বলে উঠলেন, “আমরা দুজন একসাথে মিরপুর বাংলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাঁশ করেছি। একসাথে বাণিজ্য মেলার স্টলে চাকরী করে নিজেদের পড়ালিখা, খাওয়া, থাকার খরচ জোগাড় করেছি। আমি ম্যেডিক্যেলে চান্স পাওয়ার পর অনেকদিন যাবত তার সাথে কোনরকমের যোগাযোগ ছিল না। সেই যে আইডিয়ালে পড়া মতিঝিলের টিউশনি পেয়েছি, সেখানে গিয়ে ক্ল্যাস্ম্যেটের সাথে আমার আবার দেখা। সে ইডেন থেকে অনার্স করছে আর মুভি ডাবিঙে কণ্ঠ দেয়।”
“এই ভিডিওটা বুঝি তার কাছ থেকেই?” আমার প্রথম প্রশ্ন।
“হ্যাঁ, আমি তার কাছে চেয়েছিলাম, তাই আমাকে দিয়েছিল। ওতো বিয়ে করে ফেলেছে, স্বামী সহ আমার স্টুডেন্টদের পাঁশের বাসায় থাকে। গতকাল আমি স্টুডেন্টকে পড়াচ্ছিলাম, শুনি সে তার স্বামীকে ইচ্ছামতো শাসাচ্ছে।”
“তো আমাদের কি করার আছে!”
“দেখ! ফেসবুকে হয় তো দেখে থাকবি নাস্তিকেরা কোথা থেকে যেন একজুগল মুসলিমের মারামারির ভিডিও, ছবি এনে ইসলামের নিন্দা শুরু করে। তাঁদের মুখ বন্ধ করতে আমাদেরকে মাঠে নামতেই হচ্ছে! জাতিকে তো বুঝ দিতে হবে! জাতি যদি এসব বন্ধ করে ফেলে তাহলে তো নাস্তিকেরা নির্বাক হয়ে যাবে। তারপর ইসলামের যেঁগুলো নিয়ে প্রশ্ন করবে সেগুলোর উত্তর এখন বাঁজারেই আছে!”
আশ্চর্য হয়ে আমি, “ আমাকেও সাথে করে নিবে! কিন্তু কেন? আমি তোমার সাথে সেখানে গিয়ে কি করবো? ”
কিছুটা রেগে উঠে সানজিদা আপা, “কি করবি সেটা আগে তোকে বলেই তারপর সাথে নিবো। আমার এই বান্ধবীর নাম ‘সাদিয়া নুসরাত’ আমি তোকে সাথে করে সেখানে নিয়ে যাবো, সেখানে তোর কাজ হচ্ছে আমি যেন আরগু করতে করতে উত্তেজিত না হয়ে পরি, সেটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। আমার এটিচিউড যেন স্বাভাবিক থাকে সেটাতে লক্ষ্য রাখা।”
তাঁকে আশ্বস্ত করে আমি, “ ওকে, আমি দেখবো! ”
আমি আরিফা অণু, ঢাকা সিটি কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ছি। আপু, স্যার সলিমুল্লা ম্যেডিক্যেল কলেজে এমবিবিএসে ভর্তি হবার পর আমাকে সাথে করে গ্রাম থেকে ঢাকায় এনে নিজের সঙ্গেই রেখেদিয়েছে। ইদানীং আপার টিউশনির পাশাপাশি বইলেখার শখ জেগেছে। কিছু লেখা মোবাইলে লিখে, কিছু লেখা একটা নোটবুক কম্পিউটারে লিখে কয়েকজন মিলে কন্ট্রিবিউট করে প্রকাশ করে। সেখান থেকে নাকি তার নামে ভালো আঁকারের কমিশনও আসে, সেটা আবার নতুন বই লিখার কাজে ব্যবহার করে। আপু পেয়েছে আম্মুর স্বভাব, একটা আয় থেকে নিমিষেই আরেকটা আয় বানিয়ে ফেলে। আয়ের কাজটা আমি পারি না, বাবাও পারে না।
কয়েকদিন পর শুক্রবার,
আপু আমাকে নিয়ে রিকশায় করে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দোয়েল চত্বর, নূর হোসেন চত্বর, মাওলানা ভাসানি স্টেডিয়াম, শাপলা চত্বর, বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক দেখিয়ে এজিবি কলোনির একটা বাসার সামনে রিকশাটাকে থামাতে বললেন। ভাড়া মিটিয়ে, আমাকে নিয়ে চললেন তার বান্ধবীর বাসায়।
এখানে আসার আগে রিকশায় বসে থেকেও মনে করেছিলাম, না জানে কত আলিশান বাড়িতে থাকে আপার বান্ধবী! এসে দেখি ওমা আমাদের মতোই সাদামাটা হলুদ রঙের বিল্ডিঙে স্বামীর সাথে থাকে।
গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার আগে আপা যেদিন আমাকে ঢাকায় ইন্টারে ভর্তির কথা জানালেন, সেদিন থেকে ভেবেছিলাম আপা নিশ্চয়ই কোন এক বিশাল আলিশান বাড়িতে অগুছালো ভাবে একা থাকেন, আমি গেলে সেটাকে সাজিয়ে, গুছিয়ে রাখবো । বাবাও তো আপার নামে এতো এতো প্রশংসাই করতো “নিজের খরচ নিজে চালায়, তার নাকি কোন কিছুর অভাব নাই।” আমিও তাই এসবই ভাবতাম! ওমা, ঢাকায় এসে দেখি আমাদের হাই স্কুলের ক্লাসের মতো এক বাসায় থাকে, যেখানে সব কিছু সেপারেট আর এক রুমে দুইটা বিছানা, একটা পড়ার টেবিল আর একটা আলমারি ছাড়া আর কিছুই নাই। এখন অবশ্য দুইটা বিছানাকে টেনে একত্র করে একটা বিছানা বানিয়ে ফেলেছি।
বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই কিছুক্ষনের মাঝে দ্যো তলা থেকে সাদিয়া আপার গলা শোনা গেলো। তারা থাকে চার তলা বাড়ির, তিন তলায়। দুলা ভাই সাদিয়া আপাকে বলেছে, “দেখো তোমাকে অনেক বার বলেছি। বাবা মায়ের সাথে সুন্দর করে কথা বলতে হয়। ফোনটা দিলেই খেউ খেউ শুরু করো কেন?”
সাদিয়া আপা তার জামাইকে “ঐ! ঐ! তোমার এতো জ্বলে কেন? আমি যা করেছি একদম ঠিক করেছি, উচিৎ কথা এভাবেই বলতে হয়। কেন? তারা কেন ক্ষণে ক্ষণে আমার দোষ ধরবে?”
“তারা জন্ম দিতে পারবে, আর দোষ করলে ধড়িয়ে দিতে পারবে না।” দুলাভাইয়ের পাল্টা জবাব।
“দেখো তোমার বাবা মায়ের কাছে তোমার ঋণ তারা তোমাকে হাতে রেখে লালন পালন করেছে, কিন্তু আমি চলেছি নিজের টাকায়। নিজের পরিশ্রমে, সেজন্যে আমার হিসাব আলাদা।” সাদিয়া আপুর তর্ক।
দুলাভাইয়ের আবেগি যুক্তি, “তারা তোমাকে জন্ম দিয়েছে।তারা তোমার যত্ন নিয়েছে।”
“তোমার এতো টান থাকলে তুমি যাও।তাঁদেরকে সেবা করো গিয়ে আমাকে কিছু বলতে পারবা না।”সাদিয়া আপুর তর্ক।
প্রথমবারে গিয়ে আমি যেটা বুঝলাম, তাঁদের সংসারে ভালোই ঝগড়া হয়। তর্কের পিছনে তর্ক দিতে না পারলেও অন্তত একটা কিছু বলে কথা বাড়াতে থাকে তারা। একবার তর্ক শুরু হলে সুদূর অতীতের ঘটনাকেও টেনে হিঁচড়ে বর্তমানে নিয়ে আসেন তারা। তাও সংসারটা টিকে আছে এটাই তো অনেক।
আমরা এসে দরজার সামনে দাড়িয়ে আছি দেখে, এবারের মতো ঝগড়াটা কিছুটা শুরুর আগেই থেমে গেলো।
সাদিয়া আপা আমাদেরকে দেখে, “আরে সানজিদা! আয়! ভিতরে আয়।”
আমি সাদিয়া আপার মুখের এসো এর বদলে, “আয়” শুনে বিনা শব্দে হাসছিলাম। আমরা ডাইনিং রুমে এসে সোফায় বসেছি, এমন সময় দুলাভাইও কৌতূহল নিয়ে আমাদের কে দেখতে চলে এলেন। দুলাভাইকে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে বললেন, “সানজিদা, আমার সে-ই কলেজ জীবনের ফ্রেন্ড।”
দুলাভাইও কৌতুক করে বলে উঠলেন, “তোমার কি কলেজ জীবন শেষ হয়েছে? তুমি তো এখনও কলেজের ছাত্রীই।”
এটা নিয়ে আবারও কিছুটা ফ্লাকচুয়েশনের আভাস পেয়েছিলাম কিন্তু সাদিয়া আপা যেন এবার কিছুটা ছাড় দিলেন।
সানজিদা আপা দুলাভাইকে বললেন, “ভাই, আমি কিন্তু আপনাদের মতো ঝগড়াটে না। আমি এসেছি, একটা জিনিস দেখাতে। আশা করি এটা আপনাদের জীবন পাল্টে দিবে!”
দুলাভাই এবারও একটা কৌতুকের সুযোগ পেলেন, “ডেসটিনির কি সরকারী অনুমোদন মিলে গেছে? এছাড়া তো জীবন বদলে দেওয়ার মতো আর কিছুই নাই। হা…হা…হা…হা!”
সাদিয়া আপা চোখ রাঙ্গিয়ে দুলা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে, “দেখো, শেষ বারের মতো ছাড়দিলাম। আরেকটা বাঁকা কথা বলবা তো! খুব হবে না!”
মেহমানের সামনে এভাবে শাসিত হয়ে কিছুটা বেজার মুখ করে দুলাভাই চলে যেতে যেতে বললেন, “ আচ্ছা, আমি গিয়ে সবার জন্যে নাস্তার ব্যবস্থা করি!”
দুলাভাই চলে যেতেই সাদিয়া আপাকে সানজিদা আপা বললেন, “আমি সাপ্তাহে চার দিন তোদের পাঁশের বাসায় টিউশনে আসি। সেখানে বসে, তোদের গলা শোনা যায়। আমি তোদের কথাগুলো শুনে বুঝতে পারি, তেমন সিরিয়াস কিছু নিয়ে তোদের ঝগড়া না। কিন্তু আমার স্টুডেন্টদের বাবা-মা ও অন্যরা তোদেরকে খুব খুব বকাবকি করে। তোদেরকে নিয়ে বাজে বাজে কথা বলে! এগুলো কিছু জানা আছে তোদের?”
সাদিয়া আপুর মনটা হঠাৎ খুব খারাপ হয়ে গেল, কারো দুই পয়সা খেয়ে না, কারো কোন ক্ষতি করে না, কাউকে কিছু না বলেও তিনি এসব শুনবেন সেটা কল্পনাও করতে পারেন নি বোধয়। সাদিয়া আপুদের চিৎকার করে কথা বলার বিষয়টা প্রতিবেশীরা কিভাবে নেয় সেটার নানান বর্ণনা দিচ্ছেন সানজিদা আপু। এসব কথা শুনে, সাদিয়া আপার চেহারাটা যেন ধীরে মলিন থেকেও মলিনত্তর হচ্ছে, আসলেই তাঁদের জানা ছিল না তাঁদের আচরণটাকে লোকেরা এভাবে নিবে।
দোষতো প্রতিবেশীকে দেওয়া যায় না, কারণ তারা বিরক্ত হয়েই তো নিন্দা করে। আবার সাদিয়া আপুদের নতুন সংসার এটা তো পুতুল খেলার মতোই হবে!
একদল লোক পাওয়া যাবে, এসে সমাজেকে দোষ দেওয়া শুরু করবে যে, সমাজ অন্যের সুখ দেখতে পারে না। আসলে বিষয় সেটা না, আপনি পাবগুলোতে গিয়ে যতই চিৎকার চেঁচামেচি করেন।কেউ আপনাকে কিছু বলবে না, পরিবেশতো দেখতে হবে!
সানজিদা আপু তার মোবাইলটা বের করে সাদিয়া আপার সরি বলা ক্লিপ্ট গুলো দেখালেন। সাদিয়া আপুও নিস্পলক ভাবে তাকিয়ে থেকে নিজের অন্য এক রুপ দেখতে পেলেন। কর্মক্ষেত্রে গিয়ে তিনি এভাবে অকপটে নিজের দোষ স্বীকার করে ফেলেন আর পারিবারিক জীবনে কেউ এসে দোষ ধরে দিবে, এটাকে তিনি মেনেই নেন না। মেনে না নেওয়া যেন একটা ব্যেক্তিত্বের পরিচয় মনে হতো তার কাছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে এক রকম আর নিজেরস্বার্থের বেলায় অন্যরকম কেন? এগুলো কিভাবে মানুষের মনে এসে ব্যেক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচয় পেয়ে গেলো, বিষয়টা ব্যেক্তিত্বের মালিকদেরও অজানা।
চাকরীর ক্ষেত্রে সরি বললে সেটা মেচিউরিটি আর পরিবারের কাছে হাত জোর করাকে ব্যেক্তিত্বের সাংঘর্ষিক করে দেওয়া হয়েছে। কে করেছে? কাছের মানুষগুলো নিজের দোষ ধরে দিলে, তাঁদেরকে নিজের শত্রু ভাবতে শিখিয়েছে কে?
সাদিয়া আপুর অগোচরে দুলাভাই দাড়িয়ে আপুর সরি বলাগুলো শুঞ্ছেন আর মিটিমিটি হাসছেন। হতবম্ভ সাদিয়া আপু যখন মাথা তুললেন তখন দুলাভাই বললেন, “দেখো আমরা সমাজে থাকি, বেঁচে থাকা মানেই সময়। ক্ষমা চাইতে বা সরি বলতে উপযুক্ত সময়ের দরকার হয় না। তুমিও একদিন মা হবে, ধরো আমি মারা গেলাম বা প্যেরালাইসিস হয়েগেলাম। তারপর যদি তোমার সন্তান নিজের আয়ে পড়লিখা করে, তারপর ভুল পথে চলতে থাকে। তাঁকে কি তুমি শুধরে দিবে না? আজই আম্মা-আব্বার কাছে ক্ষমা চাইবা। ক্ষমা চাইলে মানুষের ব্যেক্তিত্ব কমে যায় না। বরঞ্চ তোমার নমনীয়তা সম্পর্কে মানুষের আস্থা বেড়ে যাবে। ”
সাদিয়া আপু নির্বাক, তিনি একটু বেশিই শকড হয়ে গিয়েছেন।
No comments